মাত্র কিছুদিন আগেই ওটিটি প্লাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পাওয়া মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার ‘Redrum’ অসাধারণ সাড়া ফেলেছে দর্শকদের মাঝে।
আফরান নিশো - মেহজাবীন চৌধুরী অভিনীত দুর্দান্ত এই থ্রিলার ওয়েবফিল্মের স্পন্সর হিসেবে ছিল বিউটি ইকমার্স স্টার্টআপ ‘সাজগোজ’।
রেডরাম নিয়ে অলরেডি সোশ্যাল মিডিয়াতে, বিভিন্ন মুভি রিভিউ গ্রুপে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এবং এখনও চলছে। তবে আমার এই লেখার উদ্ধেশ্যে মোটেও মুভি রিভিউ নয়, বরং ব্র্যান্ড প্যাক্টিশনার্স এবং স্টার্টআপ ফাউন্ডারদের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা চরকি এবং সাজগোজ এর এই পার্টনারশীপটাকে এনালাইসিস করতে চাই!
এই মিনি কেইস স্টাডিতে আমি Redrum কে উদাহরণ হিসেবে ধরে চরকি এবং সাজগোজ এর Content Driven Strategy নিয়ে আলোচনা করবো।
সাজগোজ - বাংলাদেশের #1 বিউটি ইকমার্স
বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্যতম সফল ‘সাজগোজ’ এর জার্নিটা খুবই ইন্টারেস্টিং এবং এখান থেকে ফাউন্ডারদের অনেক কিছু শেখার আছে।
গত বছর 2021 এর শেষের দিকে সাজগোজ Sequoia Capital India এর Serge এর নেতৃত্বে এবং সোনিয়া বশির কবির আপুর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম SBK Venture এর অংশগ্রহণে $2 million সিড ফান্ড রেইজ করেছে।
2013 সালে সাজগোজের যাত্রা শুরু হয়েছিল সিনথিয়া ইসলাম, নাজমুল শেখ ও মিলকি মাহমুদের হাত ধরে বাংলা ভাষায় বিউটি কেয়ারের কন্টেন্ট তৈরি করা দিয়ে। সাজগোজ ডট কম এখন বাংলা ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও সেলফ কেয়ারের ওয়েবসাইট।
2018 সালের শেষের দিকে যখন বাংলাদেশের ইকমার্স বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে তখন সাজগোজ ই-কমার্স এর যাত্রা শুরু করে।
অর্থাৎ ইকমার্স রেভিনিউ মডেল হলেও সাজগোজের DNA তে Content ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সাজগোজকে তাই আমরা বলতে পারি - A Content Company Before an Ecommerce!
আলোচনার শুরুতে এই জিনিসটা বোঝাটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চরকি: ফিল্ম, ফান, ফুর্তি
প্রায় তিনবছর ধরে এক্সটেনসিভ মার্কেট রিসার্চ, হিউজ প্ল্যানিং করার পর ‘বাংলা কনটেন্টের রাজধানী’ হবার স্বপ্ন নিয়ে এবং দেশি প্ল্যাটফর্মে বিশ্বমানের বিনোদনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল প্রথম আলো ডিজিটাল এর ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফরম - চরকি।
যাত্রা শুরুর পর থেকেই একের পর এক নিজস্ব কন্টেন্ট তৈরি করার মাধ্যমে চরকি অলরেডি ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করে নিচ্ছে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এর ভাষায়, “198 দেশ থেকে মানুষ চরকিতে সিনেমা দেখছেন, চরকি হবে বিশ্বের বৃহত্তম বাংলা ওটিটি প্লাটফরম”।
এর আগে আমি “চরকি : বাংলাদেশী OTT ইন্ডাস্ট্রিতে সম্ভাবনার নতুন আলো!” নামক Business Strategy Case Study তে ‘চরকি’ কে কেইস স্টাডি ধরে ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রির এনাটমি করেছি এবং চরকির বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ইন-ডেপথ এনালাইসি করার চেষ্টা করেছি, না পড়ে থাকলে পড়তে পারেন।
চরকির নতুন অরিজিনাল ওয়েবফিল্ম রেডরামে স্টার্টআপ হিসেবে সাজগোজের স্পনসরশীপ একটা অনন্য ঘটনা।
দুইটা ভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে (Ecommerce এবং OTT) কাজ করলেও এই দুইটি কোম্পানিরই প্রধান শক্তি হচ্ছে Content.
এই মেলবন্ধন সেজন্য শুধুমাত্র নতুন একটা যুগের সুচনা তাই না, বরং স্টার্টআপ সহ অন্যান্য কোম্পানিদের জন্যও পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
‘রেডরাম’ স্পনসরশীপ - সাজগোজ এর একটা সাকসেসফুল এবং ইফেক্টিভ মার্কেটিং এক্টিভিটি
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইকমার্স এবং ওটিটি প্লাটফর্মের অডিয়েন্স মোটামুটি একই।
এই ডিজিটাল যুগে যে কোন কোম্পানিই তাদের এডভার্টাইজিং এর জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিডিও এড, ইউটিউবের জন্য শর্ট ভিডিও কন্টেন্ট ইত্যাদি করতেই পারে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে এখন আর নতুনত্ব প্রায় নেই বললেই চলে, এমনকি ভিউয়াররাও উপযুক্ত না হলে প্রায়ই স্কিপ করে যায়।
অন্যদিকে একজন কাস্টোমার বা পটেনশিয়েল কাস্টোমার যখন দেখবে একটা হিট ওয়েবফিল্ম তার পছন্দের কোন একটা কোম্পানির স্পনসরশীপে হয়েছে, তখন তার মধ্যে সেই কোম্পানির প্রতি একটা পজিটিভ ইম্প্রেশন বা ব্র্যান্ড পজিশনিং তৈরি হবে।
রেডরাম এ স্পনশরশীপ করে ঠিক এই জায়গাটাতেই বাজিমাত করেছে সাজগোজ!
Redrum রিলিজ হওয়ার আগে থেকেই ‘সাজগোজ’ তাদের বিভিন্ন প্লাটফর্মে সেটাকে জোরেসোরে প্রচার করা শুরু করে।
যমুনা ফিউচার পার্কের ব্লকবাস্টার সিনেমাস এ ‘রেডরাম’ এর প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়েছিল। স্পন্সর হিসেবে পাওয়া বেনিফিটের অংশ হিসেবে সাজগোজ তার বাছাইকৃত প্রিমিয়াম কাস্টোমারদেরকে ইনভাইট করেছিল নিশো - মেহজাবীন এর সাথে একই অডিটরিয়ামে দর্শক সারিতে বসে সেই প্রিমিয়ার শো দেখতে।
আপনার পছন্দের একটা কোম্পানি, যার কাছ থেকে আপনি প্রচুর কেনাকাটা করেন, যদি আপনাকে তারকাবহুল কোন একটা মুভির প্রিমিয়ার শোতে প্রায়োরিটি দিয়ে ইনভাইট করে নিয়ে যায় তাহলে আপনি ঠিক কতটা উচ্ছসিত হবেন ভেবে দেখুন তো?
প্রিমিয়াম কাস্টোমারদের পাশাপাশি সাজগোজ একটা স্পেশাল কম্পিটিশনও এরেঞ্জ করেছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। এই কম্পিটিশন এ জয়ীরাও আবার সুযোগ পেয়েছিল এই প্রিমিয়ার শোতে অংশগ্রহন করার জন্য।
এই ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়াতে সাজগোজ হিউজ এনগেজমেন্ট তৈরি করেছে, সাথে Customer Delight তো আছেই।
আবার একই সাথে নিশো - মেহজাবীন এর মতো তারকারা এই ক্যাম্পেইনগুলোকে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে প্রমোট করেছে, যা সাজগোজের জন্য চমৎকার Influencer Marketing হিসেবে কাজ করেছে।
মজার ব্যাপার হলো, রেডরামে ‘সাজগোজ’ স্পনসর করেছিল শুটিং শেষ হয়ে যাবার পর এবং রিলিজ এর আগে, অনেকটা হঠাৎ করেই।
ভাল করে লক্ষ্য করে দেখুন, একারণেই আমরা মুভির ভিতরে সাজগোজ এর কোন Brand Endorsement বা Product Placement দেখি নি।
যদি শুটিং এর আগে চরকির সাথে ডিলটা হতো তাহলে মুভির ভিতরে সাজগোজকে এনডোর্স করার অনেক সুযোগ ছিল।
উদাহরণস্বরুপ - নীলা (মেহজাবীন) তার ভার্সিটির ফাংশনের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজের কোন কসমেটিক্স প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারতো, নীলা প্রেগন্যান্ট থাকা অবস্থায় সাজগোজ ইকমার্স এপ থেকে ঘরে বসেই প্রডাক্ট অর্ডার করে ডেলিভারি পেতে পারতো, সাজগোজের কোন একটা রিটেইল শপের মধ্যে রাশেদ (নিশো) এবং তার গার্লফ্রেণ্ডের কোন একটা সিন শুট হতে পারতো ইত্যাদি ইত্যাদি।
চরকি এবং সাজগোজ এর এই পার্টনারশীপটা আসলে অনেকটা এক্সপেরিমেন্টই ছিল বলা চলে।
And it worked really well!
সুতরাং ভবিষ্যতে আমরা হয়তো এই ধরনের আরো পার্টনারশীপ দেখতে পাবো, সেই সাথে ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট বা প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টও দেখতে পাব।
সাজগোজের কোফাউন্ডার এবং সিইও Nazmul Sheikh ভাই এর সাথে গত কয়েকবছরে যখনই আলোচনা করেছি ততবারই তার লংটার্ম ভিশন, নতুন কিছু করার প্রচন্ড ইচ্ছা, ইনোভেটিভ যে কোন কিছুতে ক্যালকুলেটেড রিস্ক নেবার মানসিকতা দেখতে পেয়েছি।
একটা স্টার্টআপের জন্য ওয়েবফিল্মে স্পন্সর করা একটা সাহসী পদক্ষেপ বলতেই হবে। কিন্তু রেডরামের দুঃসাহসিক গল্পের জনপ্রিয়তা এবং সফলতা সাজগোজ এর লিডারদেরকে ভবিষ্যতে এরকম আরো পদক্ষেপ নিতে কনফিডেন্স দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ভিন্নতা সৃষ্টিতে চরকির সফলতা
‘RƎDЯUM’ শব্দটা আসলে MURDER (মার্ডার) শব্দটাকে উল্টোদিক থেকে লেখা বা মিরর। এটা প্রথম ব্যবহার হয়েছিল স্টিফেন কিং এর ‘The Shining’ এ।
ওটিটি প্লাটফর্মের বাংলা মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার হিসেবে উল্টো খুনের গল্প ‘রেডরাম’ নিঃসন্দেহে চরকির একটা অনন্য সৃষ্টি।
পরিচালক ভিকি জাহেদ এবং অভিনেত্রী মেহজাবীন দুইজন এর জন্যই রেডরাম ছিল প্রথম ওয়েবফিল্ম। এর আগে আমরা মেহজাবীন এবং নিশোর চরিত্রগুলোকে কাপল হিসেবেই পেয়েছি, এই প্রথম তাদের চরিত্র নীলা (মেহজাবীন) এবং রাশেদ (নিশো) জুটি না হয়ে বন্ধু আকারে উপস্থাপিত হয়েছে।
সাসপেন্স, থ্রিলার, টুইস্ট এ ভরপুর ‘রেডরাম’ এ নীলা এবং সিআইডি কর্মকতা রাশেদ এর লুক, প্রেজেন্টেশেনও ছিল ভিন্নধর্মী। শুধুমাত্র এই ওয়েবফিল্মের জন্য মেহজাবীন তার ভ্রু কেটে ফেলেছিল। এটা নিয়ে সে ফেইসবুকে একটা ভিডিও পোস্ট করেছিল যেটা ভাইরাল হয়।
রেডরামে আমরা নীলাকে (মেহজাবীন) প্রেগন্যান্ট হিসেবে দেখেছি, এমনকি তার মুখে F**k you টাইপ গালাগালিও শুনেছি। মেহজাবীন এর নতুন এই সাহসী লুক প্রশংসার দাবিদার।
এভাবে এই ওয়েবফিল্মের মাধ্যমে আমরা আমাদের অতিচেনা তারকাদেরকে নিজেদেরকে ভেঙ্গেচুরে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে দেখেছি যা কিনা তারকাদের পাশাপাশি নিঃসন্দেহে পরিচালক ভিকি জাহেদ এবং চরকির পুরো টিমের ক্রেডিট।
চরকি চাইলে কোন একটা নামকরা মাল্টিন্যাশনাল বা লোকাল কংগ্লোমারেট এই ওয়েবফিল্মে স্পন্সর হিসেবে নিতে পারতো (এবং এর ফলে মেবি টাকাপয়সাও আরো বেশি পেত)। কিন্তু লোকাল প্রমিজিং স্টার্টআপ এবং ইকোসিস্টেমকে ইন্সপায়ার করতে তারা সাজগোজের মতো কোম্পানির সাথে পার্টনারশীপটা করেছে। এটাও অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
সাজগোজের মতো ইকমার্স স্টার্টআপ কোম্পানি এবং চরকির মতো ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের মেলবন্ধন, অরিজিনাল বাংলা থ্রিলার ওয়েবফিল্ম নিয়ে দর্শকদের মাতামাতি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
সামনের দিনগুলোতে আরো অনেক অনেক কোম্পানি এগিয়ে আসুক, এরকম সাহসী পদক্ষেপ নিক এবং ইনোভেটিভ কাজ করুক এই আহবান জানিয়ে এই মিনি কেইস স্টাডিটা শেষ করছি।
আপনার মূল্যবান মতামত জানানোর জন্য আমন্ত্রণ রইলো 🙂